আমরা তখন খুলনায় থাকি, আর বাবা ঢাকায় চাকরি করেন। ঈদের ছুটিতে বাবা খুলনায় যাচ্ছিলেন ট্রেনে করে। বাবার সিটের সামনে ভিড় করে দাঁড়ানো ছিলেন বেশ কজন খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁদের কথাবার্তায় জানা গেল, তাঁরাও ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছেন। সুখ-দুঃখ আর জীবনযুদ্ধের কথা বলছিলেন তাঁরা। একপর্যায়ে একজন আরেকজনকে বললেন, ‘গত ঈদে তাও হাতে করে ছেলেমেয়েদের জন্য সেমাই, নারকেল, দুধ, চিনি এসব নিতে পারছি, এবার তো কিছুই নিতে পারলাম না। বলতে গেলে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরছি।’ কত সামান্যই না লাগে একটা মানুষের ইচ্ছে পূরণ করতে! বাবা লোকটির হাতে কিছু টাকা দিতে চাইলেন, যেন তিনি এবারেও বাড়ির জন্য অন্তত সেমাই, চিনি এসব কিনে নিতে পারেন। কিন্তু তাঁদের কথার মধ্যে কীভাবে ঢুকবেন, কী বলে টাকাটা দেবেন, এ নিয়ে বাবা ইতস্তত করছিলেন। অনেক বছর পরে বাবার মুখে ঘটনাটি শুনে অদেখা লোকটির জন্য আমার মায়া হয়েছিল।
একবার আমি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গেছি। সেখানে ব্রাজিলের এক মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। একদিন সে আমার পরা পছন্দের লাল সিল্কের শাড়িটি চেয়ে বসল। আমি ইতস্তত করছিলাম দেখে সে আমাকে ডলার সাধল। তবু আমি তাকে শাড়িটি দিলাম না। দেশে ফেরার পর যতবারই শাড়িটি দেখেছি বা পরেছি, মেয়েটির কথা আমার মনে পড়েছে। অবাক হয়ে লক্ষ করছি, আমি আর কোনো দিনই শাড়িটি আনন্দের সঙ্গে পরতে পারিনি। কী হতো শাড়িটি মেয়েটিকে দিয়ে দিলে? ওর হয়তো একটা ইচ্ছে পূরণ হতো। আর আমাকে মনে রাখত, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের উষ্ণতার কথা নিশ্চয়ই ভুলত না কোনো দিন সে।
বাবা কদিন আগে চিরকালের জন্য চলে গেলেন। একদিন আমিও যাব। আজ তাই ভাবি, সময়ের ফোঁড়টি যদি বাবা আর আমি সময়েই দিতে পারতাম, তবে নিজের কাছে এমন ছোট হয়ে থাকতে হতো না।
0 comments:
Post a Comment