আমি যেদিন প্রথম ক্রিকেট মাঠে নামি, সেদিন ভাবিনি যে ১৭ বছর ধরে খেলব। এখন যখন আমার ক্যারিয়ারের পেছনে ফিরে তাকাই, অনেক মজার ঘটনা, অনেক উত্থান-পতন মনের আয়নায় খেলা করে। মনের পর্দায় আলো ফেলে। বিশ্বকাপ জিততে না পারাটা অবশ্যই কষ্টের, কিন্তু আমি ক্যারিয়ারের আনন্দের মুহূর্তগুলোই বেশি করে ভাবি। আমি খুবই সৌভাগ্যবান একজন, কারণ ১৭ বছরের ক্রিকেটজীবনে তেমন কোনো ইনজুরিতে পড়িনি। একজন খেলোয়াড়কে তার ফিটনেস ধরে রাখার জন্য জানতে হবে যে কখন পরিশ্রম করতে হবে আর কখন বিশ্রাম নিতে হবে।
একজন অলরাউন্ডার হিসেবে আমাকে ব্যাটিং-বোলিং দুটো নিয়েই ভাবতে হতো। কিন্তু আমার দর্শন ছিল ভিন্ন। আমি চাইতাম খেলার প্রতিটি বিষয়েই মনোযোগ দিতে। যখন ব্যাটিং করতাম, তখন শুধু ব্যাটিং নিয়েই ভাবতাম আর যখন বোলিং করতাম, তখন আমার মনোযোগ থাকত কেবল বোলিংয়ের দিকে। একজন অলরাউন্ডারের সবচেয়ে বড় সুযোগ হচ্ছে, কোনো কারণে যদি ব্যাটিং বা বোলিং খারাপ হয়, তাহলে অন্যটি দিয়ে সেটা পুষিয়ে দেওয়া যায়। আমি সব সময় নিজের সেরাটাই দিতে পরিশ্রম করতাম, সেটা ব্যাটিং-বোলিং যেভাবেই হোক। আমি মনে করি, নিজের সামর্থ্য আর দুর্বলতার জায়গাগুলো বুঝতে পারা, উন্নতির জন্য ক্রমাগত পরিশ্রম করে যাওয়া—এই গুণগুলোই আমার ক্যারিয়ারের শক্তি।
ক্রিকেটে সাফল্যের জন্য কোনো শর্টকাট নেই, তাই একজন ক্রিকেটারকে ভালো করতে হলে সামর্থ্যের পুরোটুকুই দিতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্রিকেট অনেক জনপ্রিয় খেলা। মাঠে তিনটি কাঠ পুঁতে ছেলেরা ক্রিকেট খেলত, বল ছুড়ত, ব্যাটিং করত। আমার শুরুটাও হয়েছিল এভাবেই। আমার বাবা আমার খেলা দেখতেন এবং তাঁর মনে হয়েছিল, আমি এই খেলায় ভালো করতে পারব। ছোটবেলায় আমার স্বপ্ন ছিল প্রাদেশিক পর্যায়ে ক্রিকেট খেলার। বাবা আমাকে অনেক প্র্যাকটিস করাতেন। একটু বড় হওয়ার পর কোচের কাছে যাই, অনেক ভালো ভালো কোচ আমাকে খেলা শিখিয়েছেন। তাঁদের জন্যই আমি এত দূর আসতে পেরেছি। এখনকার তরুণ খেলোয়াড়েরা খেলার প্রচুর সুযোগ পায়। এখন অনেক ভালো ক্রিকেট একাডেমি আছে, বিজ্ঞ কোচেরা আছেন। সবচেয়ে বড় কথা, এখন অনেক টুর্নামেন্ট হচ্ছে, যেখানে তরুণেরা নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরতে পারছে। গত কয়েক বছরে ক্রিকেট বিশ্ব অনেক ভালো খেলোয়াড় পেয়েছে। আমি আশা করি, সামনের দিনগুলোতেও এটা চলতে থাকবে।
গত ১৭ বছরে ক্রিকেটে অনেক পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি চালু হওয়ার পর খেলাটা অনেক গতিময় হয়ে গেছে। টিকে থাকার জন্য এখন একজন ক্রিকেটারকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। টি-টোয়েন্টির শুরুতে মানিয়ে নিতে আমার অনেক ধৈর্য ধরতে হয়েছে। এই ফরম্যাটে খেলাটা একটু ভিন্ন। আমি পরিশ্রম করে গেছি এবং দেখেছি যে এর ফলে আমার খেলার অনেক উন্নতি হয়েছে। এমনকি টেস্ট ও ওয়ানডে ম্যাচেও এর সুফল পেয়েছি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য নতুন দর্শক তৈরি হয়েছে, ব্যবসায়িক দিক থেকে এটা লাভজনক। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে, আসল ক্রিকেট হলো টেস্ট ও ৫০ ওভারের ম্যাচেই আসল বিশ্বকাপ হয়। বিশ্বাস করি, ক্রিকেট এখন অনেক ভালো অবস্থানে আছে। হয়তো সামনের দিনে, অলিম্পিকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হবে, তখন খেলার আবেদন আরও নতুন মানুষের কাছে ছড়িয়ে যাবে।
শারীরিক দিক থেকে আমি এখনো অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। তা ছাড়া ওয়ানডে ক্রিকেটের আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার লক্ষ্য আমার সামনে আছে। জানি একাদশে জায়গা ধরে রাখতে আমাকে অনেক ঘাম ঝরাতে হবে, কিন্তু এটাও সত্যি যে আরেকটি বিশ্বকাপে দেশের হয়ে খেলাটা হবে আমার জীবনের স্পেশাল একটি ঘটনা।
দক্ষিণ আফ্রিকা এ পর্যন্ত একটি বিশ্বকাপও জিততে পারেনি। এর কারণ হতে পারে, আমরা আমাদের লক্ষ্য নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলাম, তাই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিতে কিছু ভুল ছিল। আবার এমনটাও সম্ভব যে পদ্ধতিগত ভুল নিয়ে বেশি চিন্তা করতে গিয়ে আমরা লক্ষ্য থেকে সরে এসেছি। এটা এমন একটি বিষয় যে দু-চারটা কথায় বলা সম্ভব নয়। আমি মনে করি, খেলাটাকে আরেকটু সহজভাবে নিলে, মাঠে স্বাভাবিক আচরণ করলে সামনের বিশ্বকাপে আমরা ভালো কিছু করতে পারব। আমার দেশের প্রত্যেক মানুষই চায় যাতে আমরা ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতি, যেমনটা জিতেছি রাগবি বিশ্বকাপ। খেলোয়াড় হিসেবেও বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ হওয়াটা আমার স্বপ্ন।
পরিচিতি
পুরো নাম জ্যাক হেনরি ক্যালিস। জন্ম ১৯৭৫ সালের ১৬ অক্টোবর, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের পাইনল্যান্ড শহরে। ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। এই গ্রহের একমাত্র ক্রিকেটার, টেস্ট ক্রিকেটে যাঁর আছে ১১ হাজারের বেশি রান এবং ২৫০-এর বেশি উইকেট। টেস্টে তাঁর রানের গড় ৫৫ দশমিক ৩৭ এবং বোলিং গড় ৩২ দশমিক ৬৫। ডারবানে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে টেস্ট ও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন এই মহাতারকা। শেষ টেস্টে সেঞ্চুরি করে ছুঁয়ে গেছেন রেকর্ড বইয়ের আরেকটি পাতা। অর্জনের ঝুলিতে আছে ২০০৫ সালের আইসিসি টেস্ট প্লেয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ড, ২০০৮ সালের উইজডেন লিডিং ক্রিকেটার। জীবন্ত এই কিংবদন্তি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন ২০১৫ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলার লক্ষ্যে।
সূত্র: ক্রিকইনফো, ডেন উইলিয়ামসকে দেওয়া সাক্ষাৎকার
0 comments:
Post a Comment