সবাইকে ধন্যবাদ। আমি আপনাদের খুব সাধারণ একটি গল্প বলতে চাই। প্রায় এক কোটি মানুষের ছোট্ট একটা গল্প। তাঁরা অন্য দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। তাদের বেঁচে থাকা মানে যেন শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া। এই মানুষগুলো যেন নিজভূমে পরবাসী।
আমার এই গল্পের লাখো চরিত্রের বসবাস সোমালিয়ায়। আফ্রিকার যুদ্ধ আর জলদস্যুপীড়িত একটি ভূখণ্ডের নাম সোমালিয়া। আর এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে যিনি নায়ক, তিনি একজন নারী। সোমালিয়ার সেই বিশালসংখ্যক সাধারণ মানুষের জীবন পরিবর্তিত হয় এই একজন নারীর কারণে। সেই নারী অন্য গল্পের নায়কদের মতন নন। আমাদের জীবনের গল্পের লাখো সাধারণ মানুষের নায়ক সেই নারী। এ যেন রুপালি পর্দার বিভিন্ন সিনেমায় দেখা, বিপদগ্রস্ত মানুষকে বাঁচাতে ছুটে আসা নায়কের ঘটনা।
সেই নারী এগিয়ে আসেন সোমালিয়ার উদ্বাস্তু মানুষের জীবন বাঁচাতে। হয়তো সিনেমার পর্দার নায়কের মতো তাঁর নেই তেমন শক্তি, তেমন গ্যাজেটস আর অ্যানিমেশনের কারিগরি প্রযুক্তি। কিন্তু তিনি আফ্রিকার অতিপরিচিত এক নাম, সবাই তাঁকে চেনে চিকিৎসক হাওয়া আবেদি নামেই। সোমালিয়ার মানুষের কাছে তিনি আশার আলো, মোমবাতির সঙ্গে তাঁকে তুলনা করা যেতে পারে। তরুণ বয়সে বিদেশে পড়াশোনা শেষে তিনি ইচ্ছা করলে গ্রহণ করতে পারতেন স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন। কিন্তু নিজের দেশের মানুষের অসহায় আর মানবেতর দৈন্য অবস্থা তিনি সহ্য করতে পারেননি। পাশ্চাত্যের রঙিন জীবন ছেড়ে ফিরে আসেন দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রিকার মাটিতে। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সেই সময়ের এই ভূখণ্ডের অন্যতম বড় এক হাসপাতাল। আশ্চর্যজনকভাবে সত্য সেই ব্যক্তিগত হাসপাতালে ছিল একটিমাত্র কক্ষ। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর খুব কাছের সেই এক রুমের হাসপাতাল ছিল এই জনপদের জন্য আশীর্বাদ।
সোমালিয়া অনেক দিন ধরেই অশান্ত এক জনপদ। সেই জনপদে জীবনধারণ যেন কঠিন, দুঃস্বপ্ন। মাদক আর যুদ্ধই যেন সোমালিয়ার সত্যিকারের বাস্তবতা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা ধর্ষণ, গুম, হত্যা, অপহরণসহ নানা ধরনের জরায় বিপর্যস্ত গোটা সোমালিয়া। এ যেন পুরো আফ্রিকা মহাদেশের সমাজজীবনের খণ্ডচিত্র মাত্র। এখন দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত এই জনপদ। মাত্র ২০ বছরের ব্যবধানে ১০ লাখ সোমালীয় মারা যায়। এর অর্ধেক হারায় তাদের বসবাসের ঠিকানা। ন্যায় আর মানবতা যখন এই জনপদে উপকথা, তখন আবেদি এগিয়ে আসেন মানবতার সেবায়।
যুদ্ধ শুরু হলে সেই এক রুমের হাসপাতালে ঢল নামে মানুষের। অসুস্থ আর আহত মানুষের সারি বিল্ডিং ছাড়িয়ে সামনের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। লাখো প্রাণ কেড়ে নিয়ে সেই যুদ্ধ সমাপ্ত হলেও সেই ভঙ্গুর মানবতা এখনো মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। তাই আমার গল্পের নায়ক সেই আবেদির কাজ এখনো শেষ হয়নি। দিনে দিনে তাঁর কাছে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক এক করে পাঁচ হাজার, ১০ হাজার, ৩০ হাজার করে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৯০ হাজারে। শুধুই কি আহত নিরীহ মানুষ তাঁর হাতে চিকিৎসা নিয়েছে? জলদস্যু, ডাকাত থেকে শুরু করে ভাড়াটে যোদ্ধার দল আহত হলে ছুটে আসে তাঁর কাছে। সেসব আহত আর নিপীড়ত মানুষের কাছে আবেদির হাসপাতাল হয়ে ওঠে স্বর্গোদ্যান। আবেদি আর দুই চিকিৎসক-কন্যাই সেই স্বর্গোদ্যানের স্রষ্টা।
যাঁর হাতে সৃষ্টি হয় এই স্বর্গোদ্যান, সেই আবেদিকে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। আক্রমণ করে তাঁর মেডিকেল ক্যাম্প। কিন্তু যেই আবেদির হাতের ছোঁয়া পেয়ে যারা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে, সেই সাধারণ মানুষও তখন চুপ করে থাকেনি। এগিয়ে আসে তাঁর ক্যাম্প রক্ষায়। সাধারণ মানুষের গণপ্রত্যাশা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপের মুখে মুক্ত হন আবেদি। মুক্তি পেয়ে তিনি এগিয়ে আসেন সাধারণ মানুষের কাতারে। কণ্ঠে আওয়াজ তোলেন, সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা বলেন। তাঁর কথা কেউ না শুনলেও তিনি হতাশ নন। আলো আসবেই বলে তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন।
জাতিসংঘ হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছে। সেই দুর্ভিক্ষে মারা গেছে অনেক মানুষ। পুরো পৃথিবী সেই দুর্ভিক্ষে সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগেই এগিয়ে আসে এই মহৎ প্রাণ। দুর্ভিক্ষের সেই সময় ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেয় নিউমোনিয়ার প্রকোপ। সেই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও সহায় ছিলেন তিনি। আল-কায়েদাসহ আরও সন্ত্রাসী দলের হুমকির তির ছুটে আসে তাঁর দিকে। ক্যাম্প বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপর আসে শ্বাস বন্ধের হুমকি। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি।
‘আমার সন্তান, তার সন্তানের সন্তান, তাদের সন্তানেরা বদলে দেবে আগামীর সময়। তাদের সততা আর মানবতা বদলে দেবে আগামীর পৃথিবী।’ এটা আমার কথা নয়, গল্পের নায়ক আবেদির কথা। অস্থির সামাজিক অবস্থা, দারিদ্র্য আমাদের মানবতার হুমকি। সহস্র বছর আগে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয় উল্কাপিণ্ডের আঘাতে। আমরা মানুষেরা বোধ হয় নিজেদের ভুলের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাব। এক পৃথিবীর মানুষ আমরা। আমার মতোই রক্ত-মাংসে গড়া আরেকজন মানুষ কেন আমার ভুলে, আমাদের কারণে হারিয়ে যাবে। আমরা কি বসে বসে টিভিতে এসব খবর দেখব আর আফসোস করব। আগামীর শিশুদের জন্য, আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আবেদিসহ যাঁরা এখন আগামীর জন্য পৃথিবী বিনির্মাণ করছেন, সবাইকে ধন্যবাদ। আমরাও এগিয়ে যাব সামনের দিকে। সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।
0 comments:
Post a Comment