শৈশব থেকেই আমি সবার সঙ্গে মজা করতে, খেলতে আর নিজেকে নিয়ে থাকতে পছন্দ করি। ওই সময়টায় সমবয়সীদের সঙ্গে অনেক দুষ্টুমি করেছি, সেসবের মধুর স্মৃতি আমি আজও ভুলতে পারিনি। আমার শৈশব সাধারণ ছিল, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে করা সব দুষ্টুমি সেটাকে রঙিন করে তুলেছে। রাস্তায়-সাগরতীরে বল নিয়ে খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, বাইকে চড়া, লুকোচুরি খেলা—কী অসাধারণ একটা সময় কাটিয়েছি! আমার এক আঙ্কেল ও আন্টি আছেন, যাঁরা ভালো গিটার বাজাতে পারেন। তাই আমাদের বাসায় সব সময় গান চলতে থাকত। সাম্বা, প্যাগোডা, গস্পেল—যেকোনো ধরনের সুরই আমাদের বাসায় শোনা যেত, সে সঙ্গে নাচ তো আছেই।
আমার খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার বাবার। আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশটাই ছিল ফুটবলকে ঘিরে। যখনই সুযোগ পেতাম, বাবার সঙ্গে ট্রেনিংয়ে যেতাম, তাঁর ম্যাচ দেখতাম। তাঁর হাত ধরেই আমার খেলতে শেখা এবং এখনো তিনি আমাকে খেলা নিয়ে উপদেশ দেন। তিনি সব সময় বলেন, তিনি এমন খেলোয়াড় ছিলেন যে সামর্থ্যের পুরোটুকু দিয়ে খেলতেন। তাঁর ক্যারিয়ারের শেষদিকটা আমার মনে আছে, কারণ তিনি যখন খেলা শুরু করেছিলেন, তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম। মাঝেমধ্যে তাঁর খেলার ভিডিওগুলো দেখি। একটি ভিডিওতে তিনি হেড দিয়ে গোল করার পর পাগলের মতো নাচতে আরম্ভ করলেন। এখন আমি গোলের পর সেলিব্রেশনের অনুপ্রেরণা তাঁর কাছ থেকেই পাই।রাস্তায় আমি প্রচুর খেলেছি, সাগরতীরেও। ছোটবেলা থেকেই ফুটসাল আমার কাছে একটা নেশার মতো। (ফুটসাল ৫/৬ জন মিলে ছোট পরিসরে খেলা ফুটবল খেলা বিশেষ) ফুটসাল পিচেই আমার ফুটবল খেলা শেখার শুরু। আমি মনে করি, একজন খেলোয়াড়ের ট্রেনিংয়ে ফুটসাল অনেক দরকারি, এটা দ্রুত চিন্তা করতে শেখায়। শর্ট সার্ভ করতে, জলদি পাস দিতে আর জোরে শুট করতে ফুটসাল সাহায্য করে।ফুটবল একটা দলীয় খেলা এবং আমি মাঠে নামি দলকে সাহায্য করতে। একটা দলে খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে অবশ্যই ভূমিকা রাখে, কিন্তু খেলায় শেষ পর্যন্ত দলই জয়ী হয়। খেলায় উন্নতির কোনো সীমা নেই। আমার বাবা ছোটবেলায় আমাকে শিখিয়েছেন ট্রেনিংয়ে নিজের শক্তির শেষটুকু ঢেলে দিয়ে আসতে এবং আমি এখনো সেটা মেনে চলি। বাঁ পায়ে শট নেওয়া, মার্কিং, ফিনিশিং, হেডিং—উন্নতির হাজারো জায়গা আছে এবং তাতে থেমে গেলে চলবে না। আমি জানি, আমি অতটা লম্বা নই, তাই হেডিংয়ে প্রচুর সময় দিয়েছি। সঠিক মুহূর্তে লাফিয়ে উঠে বলে মাথা ছোঁয়ানো—এই কাজটি করতে অনেক ট্রেনিং ও মনোযোগের প্রয়োজন।আমার কাছে আনন্দে থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের ভেতরে-বাইরে আমি একই ব্যক্তি। বাসায় আমি কার্ড খেলি, ভিডিও গেম নিয়ে মেতে থাকি, গান শুনি, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই, বারবিকিউ বানাই। তখন মজা করাটাই আমার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে যায়।গোল করার অনুভূতিটা স্বর্গীয়, কিন্তু এর চেয়েও দামি অনুভূতি হলো দলকে জেতাতে ভূমিকা রাখা। যেকোনো খেলোয়াড়ের জীবনে স্বপ্ন থাকে নিজের দেশের হয়ে খেলার। যে জার্সি পরে আমার ছোটবেলার মহানায়কেরা খেলেছেন, ব্রাজিলের সেই জার্সি পরার অনুভূতিটা আমি কখনো ভুলতে পারব না। প্রথম যেদিন আমি জাতীয় দলে ডাক পেলাম, আমার আশৈশবলালিত স্বপ্ন পূরণ হলো। মাঠে আমার সবটুকু নিংড়ে দিয়ে খেলি দেশের জন্য এবং আমার পরিবারের জন্য, যাঁরা জীবনে এতকিছু পেতে আমাকে সাহায্য করেছেন।
ব্রাজিল দলের অন্যতম স্ট্রাইকার নেইমার৷ তাঁর জন্ম ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। নেইমার ১২৯ ক্লাব ম্যাচে ৬৩ গোল ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫০ ম্যাচে ৩৩ গোল করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ‘সাউথ আমেরিকান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ সম্মান লাভ করেন তিনি। ২০১১ সালে ফিফা পুসকাস পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১৩ সালে দ্য গার্ডিয়ান নেইমারকে পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় ৬ষ্ঠ বলে স্বীকৃতি দেয়।
সূত্র: হাইসনোবিটি ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে
0 comments:
Post a Comment