শিশুতোষ সিনেমা সিরিজ হ্যারি পটার-এ অভিনয়ের জন্য সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ব্রিটিশ অভিনেত্রী এমা ওয়াটসন। জন্ম: প্যারিসে, ১৯৯০ সালের ১৫ এপ্রিল। ২০১৪ সালের মে মাসে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এমা। তিনি জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের শুভেচ্ছাদূত।
উপস্থিত সবাইকে স্বাগতম। আমরা ‘হি ফর শি’ নামের কর্মসূচি শুরু করার জন্য আজ একত্র হয়েছি। আমি আপনাদের কাছে ছুটে এসেছি কারণ, বড় কিছু করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সমাজ বদলের জন্য আমাদের বেশি সংখ্যায় মানুষের উৎসাহিত করার চেষ্টা করতে হবে। আমরা শুধু কথাই বলতে চাই না। আমরা চেষ্টা করতে চাই, বাস্তবে সমাজে বদলটা দেখতে চাই।
মাস ছয়েক আগে আমি জাতিসংঘের নারী সংস্থার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে মনোনীত হই। আমি যত বেশি ফেমিনিজম বা নারীবাদ নিয়ে নিয়ে কথা বলি, তত বেশি বুঝতে পারি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীর অধিকারের লড়াইকে পুরুষবিদ্বেষী ভাবা হয়। আমি একটা কথাই বিশ্বাস করি, সব ধরনের বিদ্বেষ রুখতে হবে। নারী ও পুরুষের সমঅধিকার ও সমান সুযোগই নারীবাদের ভাবাদর্শ। এটি আসলে নারী–পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার তত্ত্ব।
আমার বয়স যখন আট, ওই বয়সে নাটকের নিদের্শনা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় আমাকে সবাই ‘বসি’ বলে ডাকত। ১৪ বছর বয়সে আমাকে গণমাধ্যমে লিঙ্গগত বৈরী আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। ১৫ বছর বয়সে আমি আমার অনেক মেয়েবন্ধুকে খেলার দল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে দেখেছি। ১৮ বছর বয়সে এসে দেখেছি, নারীর বিরুদ্ধে অসুস্থ আচরণের বিষয়ে আমার ছেলেবন্ধুদের মুখ বন্ধ রাখতে। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমি নারীবাদী হয়ে কাজ করব। এটা আমার জন্য কঠিন কোনো বিষয় মনে হয়নি। কিন্তু আমার নিজের বেশ কিছু গবেষণায় আমি দেখি, নারীবাদ শব্দটি নিজেই পৃথিবীর কাছে অজনপ্রিয় একটি শব্দ। নারীরা তার অধিকার আদায়ে আন্দোলন করবে, এটা পৃথিবী মেনে নিতে চায় না। আমার মতো নারীদের অভিব্যক্তিকে বাড়াবাড়ি, আক্রমণাত্মক, নিঃসঙ্গ, পুরুষবিদ্বেষী এমনকি অনাকর্ষণীয় হিসেবে ধরা হয়। কেন পৃথিবী এমন বৈষম্যমূলক আচরণ করবে?
আমি তো মনে করি, আমার পুরুষ সহকর্মীর মতো সমান পারিশ্রমিক পাওয়া আমার অধিকার। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া আমার অধিকার। নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়া তার অধিকার। সামাজিকভাবে আমি আরেকজন পুরুষের মতো সমান সম্মান অর্জন করেছি। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। আমি ভাগ্যবান বলেই অধিকারগুলো পেয়েছি। বাবা-মায়ের কাছ থেকে আমি পরিপূর্ণ আদর পেয়েছি। কন্যা হয়ে জন্মানোর জন্য তাঁরা আমাকে কম ভালোবাসেননি। আমার স্কুল আমাকে মেয়ে বলে আটকে রাখেনি। আমি ভবিষ্যতে কন্যাসন্তানের মা হব বলে শিক্ষকেরা বৈষম্য দেখাননি। তাঁরা হয়তো না জেনেই আমার সঙ্গে এমন আচরণ করতেন। আমাদের এমন মানুষই দরকার বেশি করে, যারাই পৃথিবীতে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। লিঙ্গভিত্তিক সমঅধিকার প্রতিষ্ঠাই নারীবাদের মূল লক্ষ্য।
বেইজিংয়ে ১৯৯৭ সালে হিলারি ক্লিনটন নারীর অধিকার নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেদিন তিনি যে সব বিষয়ে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলেন, বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবীতে তার উপযোগিতা এখনো বিদ্যমান। আমি জেনে অবাক হয়েছি, সেই সম্মেলনে ৩০ শতাংশের কম অংশগ্রহণকারী ছিলেন পুরুষ। সম্মেলনে মোট অংশগ্রহণকারীর অর্ধেকের কমসংখ্যক পুরুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমরা কীভাবে পৃথিবীতে পরিবর্তন আনতে পারব? নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধারণ মানুষ পুরুষবিদ্বেষী হিসেবে দেখে থাকেন। শুধু নারীদের একার পক্ষে অধিকারের জন্য লড়াই করা সম্ভব নয়। পুরুষদেরও নারীর সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
নারী–পুরুষের সমঅধিকার নারীর মতো পুরুষেরও ভাবনা। সমাজ আমার বাবাকে বাবা হিসেবে তেমন সম্মান দেয়নি। আমি দেখেছি ছেলেরা নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, নানা ভয়ে তারা তাদের সমস্যা কাউকে বলতে পারে না। যুক্তরাজ্যে ২০ থেকে ৪৯ বছরের পুরুষেরা বেশি আত্মহত্যা করেন। পুরুষেরাও নানা কারণে অধিকারবঞ্চিত। সমতার সুযোগ থেকে তাঁরা অনেকেই অনেক দূরে।
নানা কারণে নারীর মতো পুরুষেরাও নির্যাতনের শিকার। আমরা একজন আরেকজনের জন্য দাঁড়িয়ে এমন বৈষম্য বিলোপ করার চেষ্টা করতে পারি। এটা স্বাধীনতার প্রশ্ন। বৈষম্য বিলোপে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে আগে। আমার প্রত্যাশা, একজন পুরুষ যেমন তাঁর কন্যা, বোন আর মায়ের জন্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যেমন কথা বলেন, তেমনি তিনি তাঁর ছেলের পাশে দাঁড়াবেন।
আপনি হয়তো ভাবছেন, হ্যারি পটার-এর এই মেয়েটা কে? সে কেন জাতিসংঘে, কী করছে? আমি নিজেও নিজেকে এমন প্রশ্ন করেছি। আমি নারী-পুরুষের অধিকারবিষয়ক নানা সমস্যা নিয়ে ভাবছি। আমি অবস্থার পরিবর্তন চাই, বদলাতে চাই। আমার কর্তব্য সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলা।
আমি দ্বিধাগ্রস্ত। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি যদি না শুরু করি, তাহলে কে করবে? যদি এখন না করি, তাহলে কখন? সামনে যখন সুযোগ আছে তাহলে আমি কেন দ্বিধাগ্রস্ত হব। আমার কথাগুলো নিশ্চয়ই একসময় কাজে দেবে। বাস্তবতা হলো, আমরা যদি কিছু না করি, তাহলে হয়তো ৭৫ বছর পরে কিংবা তারও বেশি ১০০ বছর পরে নারীরা পুরুষের মতো সমান পারশ্রমিকের অধিকার নিয়ে পথে নামবে।
সমতার পৃথিবীর জন্য আমরা সব সময় কাজ করতে চাই। ‘হি ফর শি’ এমনই এক উদ্যোগ। আমি সবাইকে সামনে পা বাড়ানোর অনুরোধ করছি। নিজেকে আমার মতো প্রশ্ন করুন, আমি যদি না শুরু করি, তাহলে কে শুরু করবে? এখন যদি শুরু না করি, তাহলে কখন শুরু হবে?
সবাইকে ধন্যবাদ।
তথ্যসূত্র: ইউএন ওয়েবকাস্ট। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত
আমার বয়স যখন আট, ওই বয়সে নাটকের নিদের্শনা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় আমাকে সবাই ‘বসি’ বলে ডাকত। ১৪ বছর বয়সে আমাকে গণমাধ্যমে লিঙ্গগত বৈরী আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। ১৫ বছর বয়সে আমি আমার অনেক মেয়েবন্ধুকে খেলার দল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে দেখেছি। ১৮ বছর বয়সে এসে দেখেছি, নারীর বিরুদ্ধে অসুস্থ আচরণের বিষয়ে আমার ছেলেবন্ধুদের মুখ বন্ধ রাখতে। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমি নারীবাদী হয়ে কাজ করব। এটা আমার জন্য কঠিন কোনো বিষয় মনে হয়নি। কিন্তু আমার নিজের বেশ কিছু গবেষণায় আমি দেখি, নারীবাদ শব্দটি নিজেই পৃথিবীর কাছে অজনপ্রিয় একটি শব্দ। নারীরা তার অধিকার আদায়ে আন্দোলন করবে, এটা পৃথিবী মেনে নিতে চায় না। আমার মতো নারীদের অভিব্যক্তিকে বাড়াবাড়ি, আক্রমণাত্মক, নিঃসঙ্গ, পুরুষবিদ্বেষী এমনকি অনাকর্ষণীয় হিসেবে ধরা হয়। কেন পৃথিবী এমন বৈষম্যমূলক আচরণ করবে?
আমি তো মনে করি, আমার পুরুষ সহকর্মীর মতো সমান পারিশ্রমিক পাওয়া আমার অধিকার। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া আমার অধিকার। নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়া তার অধিকার। সামাজিকভাবে আমি আরেকজন পুরুষের মতো সমান সম্মান অর্জন করেছি। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। আমি ভাগ্যবান বলেই অধিকারগুলো পেয়েছি। বাবা-মায়ের কাছ থেকে আমি পরিপূর্ণ আদর পেয়েছি। কন্যা হয়ে জন্মানোর জন্য তাঁরা আমাকে কম ভালোবাসেননি। আমার স্কুল আমাকে মেয়ে বলে আটকে রাখেনি। আমি ভবিষ্যতে কন্যাসন্তানের মা হব বলে শিক্ষকেরা বৈষম্য দেখাননি। তাঁরা হয়তো না জেনেই আমার সঙ্গে এমন আচরণ করতেন। আমাদের এমন মানুষই দরকার বেশি করে, যারাই পৃথিবীতে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। লিঙ্গভিত্তিক সমঅধিকার প্রতিষ্ঠাই নারীবাদের মূল লক্ষ্য।
বেইজিংয়ে ১৯৯৭ সালে হিলারি ক্লিনটন নারীর অধিকার নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেদিন তিনি যে সব বিষয়ে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলেন, বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবীতে তার উপযোগিতা এখনো বিদ্যমান। আমি জেনে অবাক হয়েছি, সেই সম্মেলনে ৩০ শতাংশের কম অংশগ্রহণকারী ছিলেন পুরুষ। সম্মেলনে মোট অংশগ্রহণকারীর অর্ধেকের কমসংখ্যক পুরুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমরা কীভাবে পৃথিবীতে পরিবর্তন আনতে পারব? নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধারণ মানুষ পুরুষবিদ্বেষী হিসেবে দেখে থাকেন। শুধু নারীদের একার পক্ষে অধিকারের জন্য লড়াই করা সম্ভব নয়। পুরুষদেরও নারীর সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
নারী–পুরুষের সমঅধিকার নারীর মতো পুরুষেরও ভাবনা। সমাজ আমার বাবাকে বাবা হিসেবে তেমন সম্মান দেয়নি। আমি দেখেছি ছেলেরা নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, নানা ভয়ে তারা তাদের সমস্যা কাউকে বলতে পারে না। যুক্তরাজ্যে ২০ থেকে ৪৯ বছরের পুরুষেরা বেশি আত্মহত্যা করেন। পুরুষেরাও নানা কারণে অধিকারবঞ্চিত। সমতার সুযোগ থেকে তাঁরা অনেকেই অনেক দূরে।
নানা কারণে নারীর মতো পুরুষেরাও নির্যাতনের শিকার। আমরা একজন আরেকজনের জন্য দাঁড়িয়ে এমন বৈষম্য বিলোপ করার চেষ্টা করতে পারি। এটা স্বাধীনতার প্রশ্ন। বৈষম্য বিলোপে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে আগে। আমার প্রত্যাশা, একজন পুরুষ যেমন তাঁর কন্যা, বোন আর মায়ের জন্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যেমন কথা বলেন, তেমনি তিনি তাঁর ছেলের পাশে দাঁড়াবেন।
আপনি হয়তো ভাবছেন, হ্যারি পটার-এর এই মেয়েটা কে? সে কেন জাতিসংঘে, কী করছে? আমি নিজেও নিজেকে এমন প্রশ্ন করেছি। আমি নারী-পুরুষের অধিকারবিষয়ক নানা সমস্যা নিয়ে ভাবছি। আমি অবস্থার পরিবর্তন চাই, বদলাতে চাই। আমার কর্তব্য সমস্যার বিরুদ্ধে কথা বলা।
আমি দ্বিধাগ্রস্ত। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি যদি না শুরু করি, তাহলে কে করবে? যদি এখন না করি, তাহলে কখন? সামনে যখন সুযোগ আছে তাহলে আমি কেন দ্বিধাগ্রস্ত হব। আমার কথাগুলো নিশ্চয়ই একসময় কাজে দেবে। বাস্তবতা হলো, আমরা যদি কিছু না করি, তাহলে হয়তো ৭৫ বছর পরে কিংবা তারও বেশি ১০০ বছর পরে নারীরা পুরুষের মতো সমান পারশ্রমিকের অধিকার নিয়ে পথে নামবে।
সমতার পৃথিবীর জন্য আমরা সব সময় কাজ করতে চাই। ‘হি ফর শি’ এমনই এক উদ্যোগ। আমি সবাইকে সামনে পা বাড়ানোর অনুরোধ করছি। নিজেকে আমার মতো প্রশ্ন করুন, আমি যদি না শুরু করি, তাহলে কে শুরু করবে? এখন যদি শুরু না করি, তাহলে কখন শুরু হবে?
সবাইকে ধন্যবাদ।
তথ্যসূত্র: ইউএন ওয়েবকাস্ট। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত
0 comments:
Post a Comment