ফেসবুকের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ও সামাজিক সাম্য আন্দোলন ‘লিন ইন’-এর উদ্যোক্তা শেরিল স্যান্ডবার্গ।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনীর জন্ম ১৯৬৯ সালের ২৮ আগস্ট
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে।২০১৪ সালে ফরচুন ম্যাগাজিন তাঁকে পৃথিবীর ১০ম
ক্ষমতাধর নারীর স্বীকৃতি দেয়।
২০১৫ সালের স্নাতক সব শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের অভিনন্দন। যখন আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, আমি ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম যে কীভাবে আমার চেয়ে বয়সে ছোট আর টগবগে একদল তরুণের সঙ্গে কথা বলব? আসলে প্রতিদিনই ফেসবুকে আমাকে এই কাজ করতে হয়। মার্ক জাকারবার্গ আমার চেয়ে ১৫ বছরের ছোট, ফেসবুকের বেশির ভাগ কর্মীই আমার চেয়ে বয়সে ছোট আর তরুণ। আমার চারপাশ তরুণেরা ঘিরে রাখে। আমাকে তারা হতভম্ব করে জিজ্ঞেস করে, ‘মুঠোফোনবিহীন আমাদের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কেমন ছিল?’ আবার কেউ কেউ আরও বিপদে ফেলে জিজ্ঞেস করে, ‘শেরিল, আমাদের নতুন পদ্ধতি বয়স্করা কেমন পছন্দ করবে তা তোমার কাছ থেকে জানতে চাই!’
আমি ১৯৯১ সালে কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করি আর বিজনেস স্কুলকে বিদায় জানাই ১৯৯৫ সালে। সেই সময়টা বেশি আগের না। কিন্তু গত ২৫ বছরে পৃথিবী আমূল বদলে গেছে। আজকে যে পৃথিবীতে বাস করছি, তা ২৫ বছর আগে কল্পনারও বাইরে ছিল। তোমরা কিন্তু ভাগ্যবান। আজ থেকে ২৫ বছর পরের প্রজন্মের জন্য তোমরা অনেক কিছু করতে পারো।
আমার মতে, দেশ নেতৃত্ব দিতে পারে না, নেতৃত্ব দেয় আসলে মানুষ। স্নাতক শেষে তোমার যাত্রা শুরু হবে। কোন ধরনের নেতা হবে তুমি, তা তোমাকেই ঠিক করতে হবে। ফেসবুক অফিসে আমরা দেয়ালে নানা ধরনের পোস্টার ঝুলিয়ে রাখি। এর একটি হচ্ছে ‘বড় চিন্তা করো।’ আজ তোমাদের নেতৃত্বের জন্য চারটি অর্থবহ গুণের কথা তোমাদের জানাতে চাই।
প্রথমত, সাহসীরা সৌভাগ্যের দেখা পায়। ফেসবুক টিকে আছে মার্ক জাকারবার্গের একটা বিশ্বাসের জোরেই। সেই বিশ্বাসের কারণেই সে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ড্রপআউটের তালিকায় নাম লেখায়। মার্ক আসলে যা করেছে তা ভাগ্যজনিত কিছু না, সে যা করেছে তা নিজের সাহসে করেছে।
মার্ক যে বয়সে ফেসবুক গড়েছে, সেই বয়সে আমার এতটা সাহস ছিল না। ২০০১ সালে সিদ্ধান্ত নিই সরকারি চাকরি ছেড়ে সিলিকন ভ্যালিতে আসার। বছর খানেক প্রচেষ্টার পরে চাকরি পাই। প্রথম ইন্টারভিউয়ে আমাকে এক প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী বলেছিলেন, ‘আপনার মতো সরকারের কাজ করা কাউকে আমি নিয়োগ দিতে পারব না।’ আমি লেগে ছিলাম, প্রযুক্তি কোম্পানিতে কাজ করতেই হবে। সেই লেগে থাকা থেকেই আমি এখনো কাজ করে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, তুমি যদি তোমার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য লেগে থাকো, তাহলে একদিন তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাবেই।
নেতৃত্বের দ্বিতীয় গুণ হলো, অন্যের মতামতকে সম্মান দেওয়া। সত্যিকারে নেতা তিনি, যিনি মতামত দিতে পারেন এবং অন্যের মতামত গ্রহণ করতে পারেন। মন দিয়ে কথা বলা আর কথা শোনা—দুটোই অনন্য মানবীয় গুণ।
তৃতীয় গুণটি হলো, সব কিছুকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা। আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে যাঁরা নেতৃত্ব দেন, তাঁদের দেখে ভাবতাম, ‘তাঁরা কত সৌভাগ্যবান, সবকিছুই তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।’ বিজনেস স্কুলে পড়ার সময় আমার ভুল ভাঙে। সত্যিকারের নেতারা অন্যদের মন জয় করতে পারেন অন্যদের কাজকে গুরুত্ব দিয়ে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ফ্রান্সিস ফ্রেইয়ের একটি কথা আছে, ‘নেতৃত্ব আসলে অনন্য সেই গুণ, যা তোমার উপস্থিতিতে শুধু অন্যদের উৎসাহ দেয় না অনুপস্থিতেও তোমার প্রভাব অন্যদের ওপর ফেলে।’
সবাইকে একসঙ্গে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ই নেতৃত্বের সর্বশেষ গুণ। চীনা প্রবাদে বলে, নারীরা অর্ধেক আকাশ আগলে রাখেন। নারীদের ভূমিকা আর কাজের অবদানের কথা সবাই স্বীকার করলেও দেশ পরিচালনায় নারী নেতৃত্ব কম দেখা যায়। হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া পৃথিবীর সব দেশেই পুরুষেরা নেতৃত্বে রয়েছেন। পৃথিবীর বড় বড় কোম্পানির মধ্যে ৬ শতাংশের কম প্রতিষ্ঠান নারীরা পরিচালনা করেন। সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বে নারীদের সংখ্যা কম। আমরা ধরে নিই, নেতা মানেই পুরুষ। নারীরা যেন শুধু অন্যদের কথা শোনার জন্যই কাজ করেন। আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবী আরও উন্নত হবে সেদিন, যেদিন অর্ধেক পুরুষ গৃহস্থালির কাজ করবে আর অর্ধেক নারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে।
আমি পরিষ্কারভাবে সবাইকে জানাতে চাই, সাম্য শুধু নারীর জন্য নয়, নারী-পুরুষ সবার জন্য মঙ্গলজনক। আমি বিশ্বাস করি তোমাদের প্রজন্ম কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষে আরও বেশি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আজকের দিনটি তোমাদের জন্য প্রতিজ্ঞা নেওয়ার সময়। আজকেই ঠিক করে নাও কেমন নেতা হতে চাও তুমি। অন্যকে কাজে উৎসাহ দাও। অন্যকে অনুপ্রাণিত করো। সাম্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করো। সামনে এগিয়ে যাও! সবাইকে অভিনন্দন।
সূত্র: ২৭ জুন ২০১৫ চীনের সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ইকোনমিকস
অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে দেওয়া শেরিল স্যান্ডবার্গের সমাবর্তন বক্তৃতা। ইংরেজি থেকে নির্বাচিত অংশের অনুবাদ
0 comments:
Post a Comment