Md. Afrooz Zaman Khan

Afrooz
Md. Afrooz Zaman Khan. Powered by Blogger.
RSS

জোছনা


"জোছনা"
লিখেছেনঃ
-------

-
তোমার নাম কী ? বাসার নতুন কাজের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো আশফা।
-জোছনা। ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো মেয়েটি।
-তুমি এখন থেকে আমাদের বাসায় থাকবে ?
-জি।
আশফা
আর কোনো প্রশ্ন না করে নিজের ঘরে চলে গেলো।
-শোনো জোছনা, তুমি তাশফা আর আশফার সঙ্গে ওদের ঘরে শোবে। তবে তোমার জিনিসপত্র ওই ঘরটায় রাখবে। আশফা আর ওর বড় বোন তাশফার পড়ার ঘর দেখিয়ে দিলেন মা।
আশফা
ওর টেডি বিয়ারটাকে কোলে বসিয়ে বই পড়ছে। ফেলুদার বই। ঠিক এই সময় ঘরে ঢুকলো জোছনা। হাতে পানিভর্তি বালতি আর ন্যাকড়া। সে ঘর মুছতে এসেছে।
-তুমি এখানে এসেছ কেন ? প্রশ্ন করলো আশফা।
—ঘরটা মুইছে দেই, বললো জোছনা।
-তুমি জানো না, কারও অনুমতি না নিয়ে তার ঘরে ঢুকতে নেই? কেন এসেছো তুমি ? বেরিয়ে যাও। এক্ষুনি বেরিয়ে যাও। চেঁচিয়ে উঠলো আশফা। সে জোছনার হাতের বালতিটা এক ঝটকায় ফেলে দিলো। প্রচণ্ড শব্দে ছুটে এলেন মা।
-এসব কী ? এগুলো কী করে হলো ? প্রশ্ন করলেন মা। জোছনা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ জলে ভেজা।
-ওকে আমার ঘরে কেন পাঠিয়েছ ? ও আমার ঘরে কেন এসেছে ? চিত্কার করে বললো আশফা।
-আহ আশফা! ওরকম বলতে হয় না। ও জানতো না, ভুল করে ফেলেছে। তুমি ওকে সব শিখিয়ে দেবে। তাহলেই ও শিখে যাবে। আর কোনো অসুবিধা হবে না, বললেন মা। আশফা কোনো কথা বললো না। মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে জোছনাকে পানিটা মুছতে বলে চলে গেলেন। রাতে জোছনা বালিশ-কাঁথা নিয়ে আশফার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
-আসুন আশফা আপু ?
-কী চাও ?
-খালাম্মা কইলো আপনার এইখানে থাকতে।
-আমি তোমাকে এখানে থাকতে দেবো না। আমি আর আপু এখানে শোব।
-আমি মাটিমে ঘুবাম আপু।
-না, তুমি এখানে শোবে না। বললো আশফা।
-ছি. আশফা, মা ওকে এখানে শুতে বলেছে। তুমি নিষেধ করছো কেন? ও তোমাকে বিরক্ত করবে না। শুধু এখানে শোবে। ওকে আসতে দাও। তুমি এসো জোছনা। বললো তাশফা। জোছনা ঘরে ঢুকে এককোণে বালিশ রেখে তাতে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো। গায়ে দিলো ছেঁড়া কাঁথা। আশফা তার টেডি বিয়ারটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
-এ কী! তুমি খালি মেঝেতে ঘুমোচ্ছ কেন ? ঠাণ্ডা লাগবে যে। আর ওই ছেঁড়া একটা কাঁথায় শীত মানে নাকি ?
দাঁড়াও
, আমি চাদর বের করে দিচ্ছি। কাঁথাটা মেঝেতে বিছিয়ে চাদরটা গায়ে দাও।
-লাগব না আপু।
-বলেছে তোমাকে লাগবে না।
তাশফা
ওর একটা শাল বের করে জোছনাকে দিল। জোছনা সেটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো।
প্রতিদিন
বিকেলে আশফা আর তাশফা ব্যাডমিন্টন খেলে। একদিন ওরা যখন খেলতে গেছে, তখন জোছনা ঘর মুছতে ওদের পড়ার ঘরে ঢুকলো। আশফার পড়ার টেবিলে ক্লাস ফোরের বই। সেগুলো দেখে জোছনা ধীরে ধীরে বইগুলোর দিকে হাত বাড়লো। বাংলা বইটা তুলে নিয়ে পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলো।
-তুমি আমার বই ধরেছো কেন ? এত্ত বড় সাহস তোমার! দাও আমার বই। জোছনার হাত থেকে বই নিয়ে নিলো আশফা।
-আশফা, ছিঃ মা! একদম এভাবে কথা বলবে না। ও তো শুধু ওগুলো দেখছিলো। কিছু তো আর নষ্ট করেনি, বললেন বাবা।
-জোছনা, এদিকে এসো। কী হয়েছে বলো তো। জিজ্ঞেস করলেন মা।
-খালাম্মা, আমি তো ফোরে পড়তাম, আশফা আপুর মতো বই-খাতা আমারও ছিল। তাই একটু দেখতে ছিলাম।
-তুমি পড়া ছাড়লে কেন ? জানতে চাইলেন বাবা।
-কী করুম কন খালুজান ? দুই বেলে খাওন নাই, মায়ে ইশকুল ছাড়ায় দিয়া ঢাহায় (ঢাকায়) পাঠাইলো। ছলছল চোখে বললো জোছনা।
-তুমি ফোরের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছো ? প্রশ্ন করলো তাশফা।
-দিছি, তয় রিজাল্ট পাওনের আগেই...। দীর্ঘশ্বাস ফেললো জোছনা।
-আগামীবার তোমাকে ক্লাস ফাইভে ভর্তি করে দেব, বললেন বাবা।
জোছনা
প্রায়ই আশফার বই-খাতার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু আশফা কখনই ওকে সেগুলো ধরতে দেয় না। একদিন মা আশফাকে কাছে ডাকলেন।
-আশফা, জানো, বাংলাদেশকে সুন্দর করতে কী দরকার ?
-কী ?
-সবার লেখাপড়া জানা দরকার। অথচ আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ অশিক্ষিত। লেখাপড়ার মূল্য তারা বোঝে না। সেখানে জোছনা সাগ্রহে পড়তে চায়। এটা ভালো কাজ। জানো, ভালো কাজে সাহায্য করলে সওয়াব হয়। আর না করলে গুনাহ হয়। তাহলে তোমার কী করা উচিত ?
আশফা
চুপ করে রইলো।
আজ
১ জানুয়ারি। নতুন বছরের প্রথম দিন। গতকাল বাবা-মা সবার জন্য উপহার কিনে এনেছেন। তবে জোছনার জন্য কিছু কেনা হয়নি। কিন্তু আশফা জোছনার জন্য উপহার রেখেছে। সে বাবাকে বলে দুই সেট বই-খাতা কিনেছে। একসেট তার, আরেক সেট জোছনার। সঙ্গে নিজের এক বাক্স রং পেন্সিল আর একটা পেন্সিল বক্স রেখেছে জোছনার জন্য। এটা জোছনার নববর্ষের উপহার।
আশফা
আর জোছনা এখন একসঙ্গে পড়াশোনা করে, খেলে আর গান গায়।
আজ
যেমন মা ঘরে ঢুকে দেখলেন আশফা আর জোছনা হাতে হাত রেখে গাইছে—
‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয়,
আমরা
করব জয় একদিন...।

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

0 comments:

Post a Comment